top of page

কিয়েভ সফরকালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে সহায়তার প্রস্তুতি জানাল ভারত।

Writer: Gobinda Biswas
Gobinda Biswas
Sep 3
6 min read

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর কিয়েভ সফরে জানালেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় ভারত প্রয়োজন হলে সহায়তা করতে প্রস্তুত। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সঙ্গে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ভারত যদি “যে কোনোভাবে” সহায়ক হতে পারে, তবে নয়াদিল্লি সেই ভূমিকা নিতে প্রস্তুত।


এই মন্তব্য সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার ঘোষণা নয়। বরং এটি একটি কূটনৈতিক সংকেত, যেখানে ভারত আবারও সংলাপ, কূটনীতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কিয়েভে দাঁড়িয়ে এই বার্তা দেওয়া ইউক্রেনের সঙ্গে ভারতের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বও বাড়িয়েছে।


ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল দৃশ্যে কিয়েভের একটি শান্ত রাস্তা দেখা যাচ্ছে।
কিয়েভ সফর ভারতের ইউক্রেন-সম্পর্কিত কূটনীতিকে নতুন মনোযোগে এনেছে।

জয়শঙ্করের বার্তার মূল অর্থ


জয়শঙ্করের বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল সংযত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেননি যে ভারত এখন থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী। তিনি এটিও বলেননি যে কোনো নির্দিষ্ট শান্তি প্রস্তাব নিয়ে নয়াদিল্লি কাজ শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, যদি ভারতের ভূমিকা সংঘাত শেষ করার কাজে সহায়ক হয়, তবে ভারত সেই সহায়তা দিতে প্রস্তুত।


এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে “সহায়তা করতে প্রস্তুত” বলা এবং “মধ্যস্থতা শুরু করা” বলা এক জিনিস নয়। প্রথমটি সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখে। দ্বিতীয়টি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, যেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি, কাঠামো এবং আলোচনার স্পষ্ট রূপরেখা থাকে।


ভারতের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই ছিল যুদ্ধের বদলে আলোচনার পক্ষে। নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে বলে এসেছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। শান্তির পথ তৈরি করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ইচ্ছা, নিরাপত্তা উদ্বেগের স্বীকৃতি এবং কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।


জয়শঙ্করের কিয়েভ মন্তব্য সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এতে নতুনত্ব হলো, বক্তব্যটি ইউক্রেনের মাটিতে দেওয়া হয়েছে এবং ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি শুধু সাধারণ নীতিগত অবস্থান নয়, বরং কিয়েভের সঙ্গে ভারতের সক্রিয় যোগাযোগেরও ইঙ্গিত।


ভারত কেন সম্ভাব্য কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ


ভারতের অবস্থান আলাদা, কারণ নয়াদিল্লির রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বহুপাক্ষিক মঞ্চ এবং ঐতিহাসিক কূটনৈতিক যোগাযোগে ভারত ও রাশিয়া ঘনিষ্ঠ। একই সময়ে ভারত ইউক্রেনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং যুদ্ধ চলাকালে মানবিক উদ্বেগ, ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কূটনৈতিক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে।


এই ভারসাম্য সহজ নয়। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ইউক্রেনের সঙ্গে কথা বলা, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা এবং নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা, সবই একই সময়ে করতে হয়েছে ভারতকে। ভারতের কূটনৈতিক ভাষায় এটি প্রায়ই “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন” হিসেবে বোঝানো হয়। অর্থাৎ, ভারত কোনো এক পক্ষের পূর্ণ অবস্থানে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।


এই কারণেই নয়াদিল্লির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। ভারত হয়তো এমন বার্তা আদানপ্রদান করতে পারে, যা সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলো বা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তব শান্তি প্রক্রিয়ায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং অন্যান্য প্রভাবশালী পক্ষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।


মূল বিষয়টি হলো, ভারত নিজেকে এমন একটি দেশ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যে পক্ষপাতমূলক সামরিক অবস্থানের বদলে কথোপকথনের সুযোগ তৈরি করতে আগ্রহী। তবে আগ্রহ থাকলেই তা সফল কূটনীতিতে পরিণত হয় না।


কিয়েভ সফরের তাৎপর্য


কিয়েভ সফর নিজেই একটি বার্তা বহন করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউক্রেনের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। এই সফরে জয়শঙ্কর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনায় যুদ্ধ, শান্তি প্রচেষ্টা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা উঠে আসে।


ইউক্রেনের দৃষ্টিতে ভারতের সঙ্গে আরও সক্রিয় আলোচনা প্রয়োজনীয় হতে পারে। কারণ ভারত বিশ্বের একটি বড় অর্থনীতি, জি২০-র গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ইউক্রেন যদি নতুন পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গড়তে চায়, তবে ভারতের মতো দেশের সম্পৃক্ততা তার জন্য কার্যকর হতে পারে।


কিয়েভে জয়শঙ্করের বক্তব্য তাই কেবল দ্বিপাক্ষিক সৌজন্য নয়। এটি যুদ্ধ নিয়ে ভারতের অবস্থানকে ইউক্রেনের সামনে সরাসরি পুনরায় তুলে ধরেছে। ভারত বলছে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো দরজা খুললে সে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভারত নিজের অবস্থানকে সীমিত রেখেছে, যাতে কোনো পক্ষ এটিকে একতরফা প্রতিশ্রুতি হিসেবে না দেখে।


আই-লেভেল দৃশ্যে কিয়েভের একটি জনচত্বরে ইউক্রেনের পতাকা উড়ছে।
ইউক্রেনের রাজধানীতে দেওয়া বার্তা ভারতের অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

আলোচনায় ব্ল্যাক সি নিরাপত্তা ও ভারতীয় নাবিকদের উদ্বেগ


জয়শঙ্কর ও সিবিহার আলোচনায় ব্ল্যাক সি বা কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ও উঠে আসে। যুদ্ধের কারণে এই এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বারবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সমুদ্রপথে আক্রমণ, মাইন, ড্রোন হামলা বা সামরিক উত্তেজনা বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করে।


ভারতের জন্য এই বিষয়টি শুধু দূরের সমুদ্র নিরাপত্তা প্রশ্ন নয়। ভারতীয় নাবিকেরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে বড় সংখ্যায় কাজ করেন। তাই ব্ল্যাক সি অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তাও প্রশ্নে আসে।


এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উদ্বেগ কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।


  • ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি সমুদ্রপথে কাজ করা নাবিকদের ঝুঁকি বাড়ে।


  • বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল খাদ্যশস্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্যের পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।


  • বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্ল্যাক সি অঞ্চলে সংঘাতের প্রভাব দূরবর্তী বাজারেও পড়তে পারে।


  • কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা বিদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লির সরাসরি আগ্রহ থাকে।


এই কারণে আলোচনায় ব্ল্যাক সি বিষয়টি উঠে আসা স্বাভাবিক। যুদ্ধ শেষের বৃহত্তর প্রশ্নের পাশাপাশি নাগরিক সুরক্ষা ও বাণিজ্যিক পথের নিরাপত্তা ভারতের জন্য বাস্তব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।


আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা নয়, তবে কূটনৈতিক দরজা খোলা


জয়শঙ্করের মন্তব্য বিশ্লেষণে সতর্ক থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক সংবাদে বড় বক্তব্য দ্রুত “শান্তি উদ্যোগ” বা “মধ্যস্থতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ঘোষিত হয়নি।


ভারত যা বলেছে, তা হলো সহায়তার প্রস্তুতি। এই সহায়তা নানা রূপ নিতে পারে। যেমন, পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলা, মানবিক ইস্যুতে যোগাযোগ সহজ করা, বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিয়ে মতবিনিময়, অথবা ভবিষ্যৎ আলোচনার পক্ষে কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু এসবই সম্ভাব্য ক্ষেত্র। কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।


বিষয়

বর্তমান অবস্থা

তাৎপর্য

ভারতের অবস্থান

সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে

যুদ্ধের বদলে আলোচনার পথকে সমর্থন

জয়শঙ্করের মন্তব্য

সহায়তার প্রস্তুতির ইঙ্গিত

আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা নয়

কিয়েভ সফর

ইউক্রেনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ

ভারতের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা দৃশ্যমান

ব্ল্যাক সি আলোচনা

বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিক নিরাপত্তা

ভারতীয় নাগরিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত

ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া

নতুন কূটনৈতিক পর্যায়ের সম্ভাবনা

শান্তি প্রচেষ্টায় বৃহত্তর অংশগ্রহণের আশা


এই টেবিল থেকে বোঝা যায়, ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাৎক্ষণিক শান্তি আলোচনার বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।


ইউক্রেনের জন্য ভারতের গুরুত্ব


ইউক্রেন চাইছে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখতে এবং শান্তি প্রচেষ্টাকে নতুন গতি দিতে। পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন কিয়েভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শুধু পশ্চিমা মিত্রদের ওপর নির্ভর করলে কূটনৈতিক পরিসর সীমিত হতে পারে। ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ বাড়ালে ইউক্রেন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়।


ভারত বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু দেশের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি পক্ষ নিতে সতর্ক। তারা খাদ্য, জ্বালানি, মুদ্রাস্ফীতি এবং উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জের দিকও বিবেচনা করে। ভারত এই উদ্বেগগুলো বুঝতে পারে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের ভাষা ব্যবহার করে।


ইউক্রেনের জন্য এই ধরনের দেশের সঙ্গে কথা বলা কৌশলগতভাবে মূল্যবান। এতে যুদ্ধের প্রশ্ন পশ্চিম বনাম রাশিয়া কাঠামোর বাইরে গিয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রবেশ করে।


হাই-অ্যাঙ্গেল দৃশ্যে কৃষ্ণসাগরে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে।
ব্ল্যাক সি অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারতীয় নাবিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ইউক্রেনের পাশে কূটনৈতিকভাবে থাকা


ভারতের জন্য সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো ভারসাম্য। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবের অংশ। একই সময়ে ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক উপেক্ষা করা যায় না, বিশেষ করে যুদ্ধের মানবিক মূল্য এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে।


নয়াদিল্লি তাই এমন ভাষা ব্যবহার করে যা সরাসরি সংঘাত বাড়ায় না। ভারত শান্তি, সংলাপ এবং কূটনীতির কথা বলে। অনেক সময় এই অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়, কারণ কেউ কেউ মনে করেন ভারত আরও স্পষ্টভাবে এক পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারত। আবার অন্যরা মনে করেন, ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই তাকে যোগাযোগের সম্ভাব্য সেতু করে তোলে।


এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বাস্তবতা হলো, ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে চাইছে। জয়শঙ্করের কিয়েভ মন্তব্য সেই নীতিরই প্রতিফলন। ভারত বলছে, সে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু নিজের ওপর এমন কোনো ভূমিকা চাপিয়ে নিচ্ছে না যা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনো গ্রহণ করেনি।


শান্তি প্রচেষ্টার পথে এখনো বড় বাধা রয়েছে


জয়শঙ্করের বক্তব্য আশাব্যঞ্জক শোনালেও যুদ্ধ শেষের পথ সহজ নয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের মধ্যে গভীর ফারাক রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা, ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময়, পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রতিটি প্রশ্নই জটিল।


শান্তি প্রক্রিয়ায় শুধু ইচ্ছা থাকলেই হয় না। দরকার স্পষ্ট আলোচনার ক্ষেত্র, গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতার কাঠামো এবং উভয় পক্ষের ন্যূনতম বিশ্বাস। এর সঙ্গে যুক্ত আছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো, রাশিয়ার অংশীদার রাষ্ট্র, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য শক্তির অবস্থান। তাই ভারতের মতো কোনো দেশের সহায়ক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এককভাবে যথেষ্ট নয়।


এই অবস্থায় জয়শঙ্করের মন্তব্যকে বাস্তবসম্মতভাবে দেখা উচিত। এটি কূটনৈতিক প্রস্তুতির সংকেত, শান্তি আলোচনার প্রত্যক্ষ সূচনা নয়। ভারত দরজা বন্ধ করছে না। কিন্তু দরজা খুলতে হলে যুদ্ধরত পক্ষগুলোরও এগিয়ে আসতে হবে।


ভারতের বার্তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে কী নির্দেশ করে


এই ঘটনা কয়েকটি বৃহত্তর প্রবণতা তুলে ধরে। প্রথমত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর শুধু ইউরোপীয় নিরাপত্তা ইস্যু নয়। এর প্রভাব খাদ্যশস্য, জ্বালানি, নৌপরিবহন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পড়েছে। তাই এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ছে।


দ্বিতীয়ত, ভারত নিজের আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে চাইছে। নয়াদিল্লি সরাসরি সামরিক সমাধানের পক্ষে নয়। বরং সে এমন ভাষা ব্যবহার করছে যেখানে শান্তি, কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থ একসঙ্গে রাখা যায়।


তৃতীয়ত, ইউক্রেনও বুঝতে পারছে যে পশ্চিমা সমর্থনের বাইরে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। ভারত সেই বিস্তৃত পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।


চতুর্থত, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কিয়েভে জয়শঙ্করের উপস্থিতি দেখায় যে নয়াদিল্লি ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ কমাতে চায় না। বরং যুদ্ধের মধ্যেও সম্পর্ক চালু রাখার চেষ্টা করছে।


ক্লোজ-আপ দৃশ্যে একটি কাঠের বেঞ্চে রাখা মানচিত্র ও ছোট ভারতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে।
ভারতের কূটনীতি ভারসাম্য, যোগাযোগ এবং সতর্কতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সতর্ক আশাবাদই সবচেয়ে বাস্তব পাঠ


এস. জয়শঙ্করের কিয়েভ বক্তব্য ভারতের কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় ভারত যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে, তবে নয়াদিল্লি প্রস্তুত। এই বার্তায় মানবিক উদ্বেগ, কৌশলগত ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে আছে।


তবে এটি শান্তি প্রক্রিয়ার বড় অগ্রগতি নয়। কোনো আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ঘোষণা হয়নি। কোনো নতুন শান্তি কাঠামোও সামনে আসেনি। ভারতের ভূমিকা এখন সম্ভাবনার পর্যায়ে, প্রতিশ্রুতির নয়।


তবু এমন সংকেতের মূল্য আছে। দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা নিজেই কূটনীতির অংশ। ভারত রাশিয়ার সঙ্গেও কথা বলতে পারে, ইউক্রেনের সঙ্গেও। সেই অবস্থান তাকে এক ধরনের ব্যবহারযোগ্য চ্যানেল করে তুলতে পারে, যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সত্যিই আলোচনার দিকে এগোয়।


বর্তমান মূল্যায়ন তাই সংযত হওয়া উচিত। জয়শঙ্করের মন্তব্য যুদ্ধ শেষের ঘোষণা নয়। কিন্তু এটি জানায়, ভারত শান্তির আলোচনায় পাশে দাঁড়ানোর দরজা খোলা রাখছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, এমন কূটনৈতিক দরজাগুলোর গুরুত্ব ততই বাড়বে।


Comments

Rated 0 out of 5 stars.
No ratings yet

Add a rating
bottom of page