আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ও ভারতের কূটনৈতিক জয়:২৭৪ জন পলাতক আসামিকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং ১৮০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ

বিশ্বজুড়ে অপরাধীদের সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল ধ্বংস করার লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। অপরাধ করে বিদেশে পালিয়ে থাকা ২৭৪ জন দাগী আসামিকে সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং সেই সাথে বিভিন্ন ব্যাংকিং জালিয়াতি ও আর্থিক অপরাধের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা ১৮,০০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া সম্পদ উদ্ধার ও ফেরত আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ও প্রত্যর্পণ (Extradition) প্রক্রিয়ার ইতিহাসে এটি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম সাফল্য।
'অপারেশন ত্রিশূল' (Operation Trishul): আন্তর্জাতিক পুলিশিংয়ের নতুন দিগন্ত
ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI), এনআইএ (NIA), এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB) যৌথভাবে বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করে আসছে, যার নাম 'অপারেশন ত্রিশূল'।
২৭৪ জন পলাতক আসামিকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং ১৮০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ
ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও জিও-লোকেশন: এই অভিযানের মূল ভিত্তি হলো প্রযুক্তিভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি। যেসব অপরাধী ছদ্মনাম ব্যবহার করে বা ভুয়া পাসপোর্টে বিদেশের মাটিতে আত্মগোপন করেছিল, তাদের স্যাটেলাইট ইমেজ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং গ্লোবাল ডেটাবেস বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়।
গ্লোবাল নেটওয়ার্কিং: সিবিআই-এর অধীনস্থ স্পেশাল গ্লোবাল অপারেশন্স সেন্টার ইন্টারপোল (Interpol)-এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা সংযোগ রক্ষা করে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
২৭৪ জন প্রত্যর্পিত আসামি: কাদের ফিরিয়ে আনা হলো?
২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক আইনি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ৩৬টিরও বেশি দেশ থেকে ২৭৪ জন পলাতক আসামিকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ।

১. সংগঠিত অপরাধ ও গ্যাংস্টার: বেশ কয়েকজন কুখ্যাত মাফিয়া ও গ্যাংস্টার, যারা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসে ভারতের অভ্যন্তরে তোলাবাজি ও সুপারি কিলিং পরিচালনা করছিল।
২. নার্কো-টেররিজম ও চরমপন্থা: আন্তঃদেশীয় মাদক পাচার এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অর্থায়নে জড়িত একাধিক অভিযুক্তকে ইউরোপ ও গালফ দেশগুলো থেকে গ্রেফতার করে দেশে আনা হয়েছে।
৩. আর্থিক অপরাধী: যেসব ব্যবসায়ী ও প্রমোটর ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি করে ব্রিটেনে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপে বা মধ্যপ্রাচ্যে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের বড় একটি অংশকে আইনি ফাঁদে ফেলে প্রত্যাবাসন করা হয়েছে।
১৮,০০০ কোটি টাকারও বেশি উদ্ধার ও ব্যাংকে ফেরত
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
PMLA আইনের কড়া প্রয়োগ: মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর অধীনে বিদেশে অবস্থিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মূল্যবান স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, শেয়ার এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

প্রতারিত ব্যাংকের হাতে অর্থ সমর্পণ: বিজয় মালিয়া, নীরব মোদী ও মেহুল চোকসির মতো বড় মাপের আর্থিক প্রতারকদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশে বিক্রি করে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ১৮,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার: 'ভারতপোল' ও নতুন ফৌজদারি আইন
এই বিশাল সাফল্য কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে আসেনি, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনার ফলেই সম্ভব হয়েছে।
BHARATPOL-এর ভূমিকা: ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে চালু হওয়া 'ভারতপোল' ব্যবস্থা দেশের ১,৪০০-এরও বেশি কেন্দ্রীয় ও রাজ্যভিত্তিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ইন্টারপোলের সরাসরি লাইভ ডেটাবেসের সাথে সংযুক্ত করেছে।
অনুপস্থিতিতে বিচার (Trial in Absentia): নতুন ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-এর ধারা ৩৬৫ অনুযায়ী, অভিযুক্ত বিদেশে পালিয়ে থাকলেও ভারতে তার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে শাস্তি ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক স্তরে 'দাগী অপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত করা সহজতর হয়েছে।
ইন্টারপোল রেড কর্নার নোটিশ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের অনুরোধে জারি করা 'রেড কর্নার নোটিশ'-এর সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনীকে যেকোনো সময় অপরাধীদের আটক করার আইনি এখতিয়ার দেয়।
অপরাধ জগতের বার্তা: দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে রেহাই নেই
ভারতের এই কড়া অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির নতুন কৌশলগত প্রভাব তুলে ধরে। অতীতে অর্থনৈতিক বা ফৌজদারি অপরাধ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের ফিরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল কূটনৈতিক জটিলতা হিসেবে দেখা হতো। তবে বর্তমান আইনি পরিকাঠামো ও 'অপারেশন ত্রিশূল'-এর সাফল্য প্রমাণ করে যে অপরাধী বিশ্বের যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, ভারতীয় আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব।
এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে একদিকে যেমন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধ চক্রের কোমর ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
Operation Trishul-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে পলাতক অপরাধীদের কীভাবে ট্রেস ও প্রত্যাবাসন করা হয়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন: Operation Trishul Explained Video।
২৭৪ জন পলাতক আসামিকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং ১৮০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ।


Comments