রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে শুভেন্দু গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত গেরুয়া সম্মান যাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন

কলকাতা, ৯ সেপ্টেম্বর: গেরুয়া প্রতীকের মর্যাদা, ত্যাগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বার্তা সামনে রেখে বুধবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’। গোলপার্ক থেকে যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এই পদযাত্রার নেতৃত্বে ছিলেন বিজেপি নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। মিছিলে সাধু-সন্ন্যাসী, সংগঠনের কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ যোগ দেন।
গেরুয়া পতাকা হাতে অংশগ্রহণকারীরা গোলপার্ক থেকে যাদবপুরের দিকে এগিয়ে যান। মিছিলকে ঘিরে দক্ষিণ কলকাতার একাধিক এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কিছু রাস্তায় অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

গোলপার্ক থেকে যাদবপুর রুট দক্ষিণ কলকাতা জুড়ে নজর কাড়ে
পদযাত্রার পথ ছিল রাজনৈতিক এবং প্রতীকী, দু’দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। গোলপার্ক দক্ষিণ কলকাতার পরিচিত সংযোগস্থল। সেখান থেকে যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তা সাধারণত ব্যস্ত থাকে। অফিসযাত্রী, শিক্ষার্থী, বাস ও অটো চলাচল, স্থানীয় দোকানপাট, সব মিলিয়ে এই পথের ওপর চাপ থাকে প্রায় সারা দিন।
এই প্রেক্ষাপটে মিছিলের জন্য আগাম নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করা হয়। পুলিশ কয়েকটি জায়গায় ব্যারিকেড বসায়। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয় কিছু অংশে। কিছু রাস্তায় যান চলাচল সাময়িকভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গেট নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যাতে কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক মহল থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে গেরুয়া পতাকা দেখা যায়। স্লোগান এবং ব্যানারে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা গুরুত্ব পায়। আয়োজকদের বক্তব্যে গেরুয়া রংকে ত্যাগ, সাধনা এবং সনাতন ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
শুভেন্দু অধিকারী এই পদযাত্রাটিকে মর্যাদা ও পরিচয়ের আবহে রূপ দিয়েছিলেন

শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়। তিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা এবং রাজ্য বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর নেতৃত্বে হওয়া এই পদযাত্রা তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রাজ্য রাজনীতির আলোচনাতেও জায়গা করে নিয়েছে।
মিছিলের মূল বার্তায় গেরুয়া প্রতীকের মর্যাদা রক্ষার কথা উঠে আসে। আয়োজকদের দাবি, গেরুয়া শুধু কোনও রাজনৈতিক চিহ্ন নয়। তাঁদের বক্তব্যে এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক ভাবনা, সন্ন্যাস, ত্যাগ এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
এই দাবি থেকেই ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’ নামটি বেছে নেওয়া হয়েছে বলে আয়োজক মহলের ব্যাখ্যা। তাঁদের বক্তব্যে সনাতন ধর্মের প্রতি সম্মান, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ সামনে আসে। মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা এই ধারণাগুলিকেই জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ধরনের কর্মসূচিতে প্রতীকের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গেরুয়া রং ভারতের জনজীবনে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সামাজিক অর্থ বহন করে। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনীতিতে এটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে এই যাত্রা নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই দুই স্তরে তৈরি হয়েছে, একদিকে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বার্তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক অবস্থান।

যাদবপুরের প্রেক্ষাপট মিছিলটিকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছিল
যাদবপুরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্ক রাজ্য রাজনীতিতে বারবার সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, ছাত্ররাজনীতি, মতপ্রকাশের পরিসর এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে যাদবপুরের দিকে পদযাত্রার গন্তব্য নির্ধারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
গোলপার্ক থেকে যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মিছিলের পথ শহরের সেই অংশের মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই এলাকায় ছোট-বড় মিছিল, প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক সমাবেশ নতুন নয়। তবু ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’ আলাদা নজর কেড়েছে তার প্রতীকী ভাষা এবং নেতৃত্বের কারণে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে ঘিরেও আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপ। মিছিল বা পাল্টা জমায়েতের কারণে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি না হওয়ার জন্য এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন রাজনৈতিক আবহে এই সিদ্ধান্তও নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
মিছিলে অংশ নেওয়া সাধু-সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি আয়োজকদের বার্তাকে আরও স্পষ্ট করে। সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে, বেলডাঙা ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বামী প্রদীপ্তানন্দ, যিনি কার্তিক মহারাজ নামেও পরিচিত, মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি কর্মসূচির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিককে সামনে এনেছে।
মিছিল জুড়ে নিরাপত্তা কড়া ছিল।
মিছিল ঘিরে পুলিশি নজরদারি ছিল সুপরিকল্পিত। দক্ষিণ কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। যান চলাচল যাতে পুরোপুরি থমকে না যায়, সে জন্য ট্রাফিক পুলিশের আলাদা ব্যবস্থা ছিল। সাধারণ মানুষের চলাচল, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির রুট, জরুরি পরিষেবা, সব দিক মাথায় রেখেই নিয়ন্ত্রণ চালানো হয়।
বড় মিছিলের ক্ষেত্রে কলকাতায় ট্রাফিক চাপ বাড়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে গোলপার্ক, ঢাকুরিয়া, যাদবপুরের মতো অংশে রাস্তার ওপর চাপ দ্রুত বাড়ে। সেই কারণে অস্থায়ী রুট পরিবর্তন, ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর নির্দেশ এবং নির্দিষ্ট সময়ে কিছু অংশে যান নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পুলিশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল মিছিলের পথ খোলা রাখা এবং একই সঙ্গে সাধারণ যাতায়াত চালু রাখা। কোনও বড় অপ্রীতিকর ঘটনার খবর সামনে আসেনি, যা প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তবু এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে কিছুটা প্রভাব পড়ে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের নিরাপত্তা বিশেষভাবে নজরে রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গেট নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এই কারণে গুরুত্ব পায়। ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরে যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেটাই ছিল প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

গেরুয়া পরিচয়ের প্রকাশ্য প্রদর্শনের পর রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য স্পষ্ট। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি গেরুয়া প্রতীকের সম্মান রক্ষার কর্মসূচি। তাঁদের মতে, গেরুয়া রংকে কেবল দলীয় রাজনীতির চোখে দেখা ঠিক নয়। এটি বহু শতাব্দীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত।
বিরোধীদের একাংশ এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, যাদবপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকাকে গন্তব্য করে এই মিছিলের মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ধর্মীয় প্রতীককে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে।
এই মতপার্থক্যই কর্মসূচিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন, অন্যদিকে রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই টানাপোড়েন নতুন নয়। কিন্তু শহরের শিক্ষিত নাগরিক পরিসর এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় এমন কর্মসূচি হলে প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়।
গেরুয়া সম্মান যাত্রা কলকাতা জুড়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে বুধবারের পদযাত্রা দেখাল, প্রতীক, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ এবং আঞ্চলিক রাজনীতি এখনও রাজ্যের জনপরিসরে তীব্রভাবে প্রভাব ফেলছে।
কেন এই পদযাত্রা একটি দিনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ
এই পদযাত্রার তাৎপর্য শুধু কত মানুষ অংশ নিলেন, তা দিয়ে মাপা যাবে না। এর গুরুত্ব রয়েছে বার্তায়, রুট নির্বাচনে এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায়।
গোলপার্ক থেকে যাদবপুরের রুট শহরের এক চিন্তাশীল, ছাত্র-রাজনীতি-সচেতন এবং সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। এই এলাকায় কোনও প্রতীকী পদযাত্রা হলে তা দ্রুত মতাদর্শের আলোচনায় ঢুকে পড়ে। গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে এই কর্মসূচিও তার ব্যতিক্রম নয়।
আয়োজকদের বক্তব্যে দুটি বিষয় বারবার উঠে আসে। প্রথমটি সাংস্কৃতিক অধিকার। দ্বিতীয়টি ধর্মীয় পরিচয়ের মর্যাদা। তাঁদের মতে, গেরুয়াকে অপমান করা বা সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ত্যাগ, সাধনা এবং ভারতীয় সভ্যতার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য।
বিরোধী শিবিরের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক মঞ্চে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করলে সামাজিক বিভাজনের আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে এমন কর্মসূচি হলে তা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এই দুই অবস্থানের সংঘাতই রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কোনও একটি প্রতীক যখন জনসমক্ষে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা পায়, তখন সেটি নিয়ে বিতর্ক হওয়াও স্বাভাবিক।

বুধবারের কর্মসূচির পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আরও বাড়তে পারে। বিজেপি এই পদযাত্রাকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্মানের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলি এটিকে রাজনৈতিক মেরুকরণের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
প্রশাসনের দিক থেকেও ভবিষ্যতের কর্মসূচিতে একই ধরনের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, বড় সংযোগস্থল এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রুটে মিছিল হলে আগাম পরিকল্পনা জরুরি।
এই পদযাত্রা একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে। কলকাতার রাস্তায় প্রতীকের রাজনীতি এখনও শক্তিশালী। গেরুয়া পতাকা হাতে গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত হাঁটা শুধু একটি মিছিল ছিল না। এটি ছিল সাংস্কৃতিক দাবি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনপরিসরে পরিচয়ের লড়াইকে সামনে আনার একটি দৃশ্যমান প্রচেষ্টা।




Comments