top of page

ক্যামাক স্ট্রিটে ইডির অভিযান ও ঘেরুয়া সম্মান যাত্রা বাংলার রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে

Writer: Gobinda Biswas
Gobinda Biswas
Sep 7
7 min read

কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন আর শুধুই একটি প্রশাসনিক বা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতা পুলিশের তৎপরতা, তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে হাজিরার নোটিস, কাঁকুড়গাছিতে ED-র অভিযান এবং একই সময়ে ঘোষিত গেরুয়া সম্মান যাত্রা, এই সব মিলিয়ে রাজ্য রাজনীতির পারদ নতুন করে চড়েছে।


পুলিশ সূত্রে খবর, শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ প্রাক্তন আইপিএস এবং তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে হাজিরার নোটিস দিয়েছে। তাঁকে ৯ সেপ্টেম্বর থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে। এর আগে দু’বার পুলিশ তাঁর বাড়িতে গেলেও নোটিস দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়। এবার সরাসরি নোটিস দেওয়ার পর তদন্তের গতি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।


ক্যামাক স্ট্রিটে একটি বিলবোর্ড সরানোকে ঘিরে বিক্ষোভ, ধস্তাধস্তি এবং রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েই এই তদন্ত। ঘটনায় একাধিক তৃণমূল নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দলের আরও কয়েকজন নেতার নামও তদন্ত-সম্পর্কিত আলোচনায় উঠে এসেছে বলে রাজনৈতিক মহলে দাবি করা হচ্ছে।


ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল দৃশ্যে কলকাতার একটি ব্যস্ত রাস্তায় পুলিশ ব্যারিকেড দেখা যাচ্ছে
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকে ঘিরে শহরে পুলিশি নজরদারি বেড়েছে।

হাজিরার নোটিস ঘিরে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে


হুমায়ুন কবীরকে নোটিস দেওয়া এই তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি নিজে প্রাক্তন আইপিএস অফিসার হওয়ায় পুলিশি প্রক্রিয়া, নোটিস, জিজ্ঞাসাবাদ এবং আইনি নিয়ম সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই কারণে তাঁর বক্তব্যও রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক দুই দিক থেকেই গুরুত্ব পাচ্ছে।


তাঁর দাবি, বিলবোর্ড সরানোর সময় নিয়ম মেনে কাজ করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে কী ঘটেছিল এবং কারা কী ভূমিকা নিয়েছিল। তিনি পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে তদন্তের আগে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ধরন এবং ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি ভালোভাবে দেখা উচিত।


পুলিশের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে, মামলার তদন্তের স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালীন কোনও ব্যক্তির বক্তব্য, উপস্থিতি বা ভূমিকা যাচাই করা পুলিশের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। এই পর্যায়ে কাউকে দোষী বলা হচ্ছে না, বরং ঘটনার ক্রম, উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং উপলব্ধ প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে।


এই ধরনের ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, পুলিশি রিপোর্ট এবং প্রশাসনিক অনুমতির কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিলবোর্ড সরানো সরকারি নিয়মে হয়েছে কি না, সেখানে কোনও রাজনৈতিক বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, ধস্তাধস্তি কীভাবে শুরু হয়েছিল, এসব প্রশ্নই তদন্তের কেন্দ্রে থাকতে পারে।


ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডে রাজনৈতিক নাম উঠে আসায় বিতর্ক বেড়েছে


ক্যামাক স্ট্রিট কলকাতার পরিচিত এলাকা। প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কারণে এই এলাকা সব সময় নজরে থাকে। সেখানে একটি বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে এমন চাপানউতোর তৈরি হওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রা পায়।


তদন্তের সূত্রে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের নাম আলোচনায় উঠে আসায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনের মতো নেতাদের নাম সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক পরিসরে আলোচিত হওয়ায় শাসক দলের ভিতরে এবং বাইরে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যদিও এই পর্যায়ে নাম উঠে আসা মানেই কোনও অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তের কাজ হল ঘটনাক্রম যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া।


তৃণমূল শিবিরের একাংশের অভিযোগ, ঘটনা রাজনৈতিকভাবে বড় করে দেখানো হচ্ছে। তাদের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে অযথা রাজনৈতিক আবহ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, শাসক দলের প্রভাব আছে বলেই পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং পুরো ঘটনাটি জনসমক্ষে পরিষ্কার করা উচিত।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত দুই স্তরে প্রভাব ফেলে।


  • আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে প্রশাসনের ভূমিকা সামনে আসে।

  • রাজনৈতিক বক্তব্যে ঘটনাটি বড় প্রতীকে পরিণত হয়।


ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। একদিকে পুলিশ তদন্ত করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলি ঘটনাটিকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।


আই-লেভেল দৃশ্যে বর্ষার দিনে পুলিশের একটি গাড়ি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে
তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ বিভিন্ন সূত্র যাচাই করছে।

হুমায়ুন কবীরের বক্তব্যে ফুটেজ ও নিয়মের প্রশ্ন


হুমায়ুন কবীর পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে প্রক্রিয়ার বৈধতা। তাঁর দাবি, বিলবোর্ড সরানোর সময় নিয়ম মানা হয়নি। তিনি আরও বলেছেন, ভিডিও ফুটেজে প্রকৃত পরিস্থিতি ধরা পড়বে।


এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একটি ঘটনাকে ঘিরে যখন দুই পক্ষ ভিন্ন দাবি করে, তখন ফুটেজ এবং নথিপত্রই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হয়ে ওঠে। যদি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ভিডিও বা সংবাদমাধ্যমের ফুটেজ পাওয়া যায়, তা তদন্তে বড় ভূমিকা নিতে পারে।


পুলিশ সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখে।


  • বিলবোর্ড সরানোর অনুমতি ছিল কি না

  • কার নির্দেশে কাজ শুরু হয়েছিল

  • ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন

  • বিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, না সংগঠিত

  • ধস্তাধস্তির সূত্রপাত কোথা থেকে

  • পুলিশ সেখানে পৌঁছে কী পদক্ষেপ নেয়


এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক মেটানোর জন্য নয়, মামলা কোন পথে এগোবে তা নির্ধারণের জন্যও জরুরি।


হুমায়ুন কবীরের মতো একজন প্রাক্তন পুলিশকর্তা যখন তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বিষয়টি আরও আলোচিত হয়। কারণ তিনি প্রশাসনিক পদ্ধতি সম্পর্কে পরিচিত। একই সঙ্গে তিনি বর্তমানে একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের মিলিত পরিসর থেকে দেখা হচ্ছে।


কাঁকুড়গাছিতে ED অভিযান আলাদা চাপ তৈরি করেছে


ক্যামাক স্ট্রিট তদন্তের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত একটি তদন্তে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, অর্থাৎ ED, কলকাতার কাঁকুড়গাছির একটি বহুতলে অভিযান চালিয়েছে বলে খবর। তদন্তকারীরা সেখানে নথিপত্র এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখছেন।


ED অভিযানের ক্ষেত্রে সাধারণত আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাঙ্কিং রেকর্ড, সংস্থার কাগজপত্র এবং ডিজিটাল নথি পরীক্ষা করা হয়। যদিও এই অভিযানের নির্দিষ্ট ফলাফল নিয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবু রাজনৈতিক আবহে এই অভিযান আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।


পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ED, CBI বা আয়কর দফতরের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। শাসক দল প্রায়ই অভিযোগ করে যে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিরোধীরা পাল্টা দাবি করে, দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়াই উচিত।


কাঁকুড়গাছির অভিযান সেই পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডের পুলিশি তদন্তের সঙ্গে সরাসরি এই অভিযানের সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই। তবু একই সময়ে দুই আলাদা তদন্তমূলক পদক্ষেপের খবর রাজ্য রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।


ক্লোজ-আপ দৃশ্যে একটি বহুতলের প্রবেশপথে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখা যাচ্ছে
কাঁকুড়গাছির অভিযানে নথিপত্র খতিয়ে দেখার খবর সামনে এসেছে।

গেরুয়া রংকে ঘিরে সম্মান যাত্রার ঘোষণা


এই পরিস্থিতির মধ্যেই কলকাতায় গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা হয়েছে। আয়োজকদের বক্তব্য, গেরুয়া শুধু একটি রং নয়, এটি ত্যাগ, আত্মনিবেদন এবং সনাতন ঐতিহ্যের প্রতীক। সেই বার্তা সামনে রেখেই গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত মিছিলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।


প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মিছিলটি ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় গোলপার্ক থেকে শুরু হয়ে যাদবপুরে শেষ হওয়ার কথা। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই কর্মসূচি হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। ফলে তাঁর নেতৃত্বে এই মিছিল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এই গেরুয়া সম্মান যাত্রা শুধু একটি সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় প্রতীকী কর্মসূচি হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন। কারণ যে সময়ে রাজ্যে পুলিশি তদন্ত, কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান এবং রাজনৈতিক বিতর্ক একসঙ্গে চলছে, সেই সময়ে রংকে কেন্দ্র করে মিছিলও স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।


গেরুয়া রং ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী প্রতীক। বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি এই রংকে ত্যাগ, সাধনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, রংয়ের রাজনৈতিক ব্যবহার সমাজে বিভাজনের আবহও তৈরি করতে পারে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সংঘাতই সাম্প্রতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।


৯ সেপ্টেম্বর একাধিক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে


এই মুহূর্তে ৯ সেপ্টেম্বর তারিখটি বিশেষভাবে নজরে রয়েছে। ওই দিন হুমায়ুন কবীরকে থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে। একই দিন বিকেল ৩টায় গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে মিছিলের কর্মসূচি রয়েছে। ফলে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক, দুই দিক থেকেই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


পুলিশের সামনে কয়েকটি দায়িত্ব থাকবে। হাজিরা, জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার তদন্ত যেমন চলবে, তেমনই শহরের পথে মিছিল হলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি হবে। কলকাতার দক্ষিণ অংশে গোলপার্ক, ঢাকুরিয়া, যাদবপুরের মতো এলাকায় সাধারণত যানজটের চাপ থাকে। মিছিলের কারণে যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। প্রশাসন সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারে।


রাজনৈতিকভাবে ওই দিন শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্য জোরালো করতে পারে। তৃণমূল পুলিশের তদন্তকে আইনি প্রক্রিয়া বলে তুলে ধরতে পারে, আবার বিরোধীরা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রতীকের প্রশ্নে সরব হতে পারে। একই সঙ্গে ED অভিযানের প্রসঙ্গও রাজনৈতিক বক্তৃতায় উঠে আসতে পারে।


বাডস-আই ভিউতে কলকাতার একটি রাস্তা ধরে মানুষের মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে
গোলপার্ক থেকে যাদবপুর পর্যন্ত মিছিলের কর্মসূচি শহরের নজর কেড়েছে।

শাসক ও বিরোধী শিবিরের বক্তব্য আরও তীব্র হতে পারে


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্যামাক স্ট্রিট মামলা, কাঁকুড়গাছিতে ED অভিযান এবং গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে মিছিল, এই তিনটি ঘটনাই আলাদা হলেও রাজনীতির মাটিতে তারা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কারণ প্রতিটি ঘটনাই ক্ষমতা, প্রশাসন, তদন্ত এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে আনছে।


শাসক দল তৃণমূলের সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাদের নেতাদের নাম তদন্ত-সম্পর্কিত আলোচনায় আসছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তৃণমূল সম্ভবত এই সব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই তুলে ধরবে, এমন ইঙ্গিত আগেও বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে।


বিরোধী বিজেপির সামনে সুযোগ হল আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি তদন্ত এবং সাংস্কৃতিক প্রতীকের প্রশ্নে জনমত তৈরি করা। গেরুয়া রংকে সম্মানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে তারা নিজেদের সাংগঠনিক বার্তা জোরদার করতে চাইতে পারে। শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি সেই বার্তাকে আরও স্পষ্ট করবে।


বাম-কংগ্রেসের মতো অন্য বিরোধী শিবিরও এই ঘটনাগুলিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে পারে। তারা একদিকে তৃণমূলের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, অন্যদিকে বিজেপির ধর্মীয় প্রতীক নির্ভর রাজনীতিরও সমালোচনা করতে পারে। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্ক ত্রিমুখী চরিত্রও নিতে পারে।


তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী হতে পারে


ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ডে পুলিশের তদন্ত এখন কয়েকটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে। হুমায়ুন কবীর থানায় হাজির হলে তাঁর বক্তব্য নথিবদ্ধ করা হতে পারে। প্রয়োজনে তাঁকে ঘটনার সময় তাঁর অবস্থান, ভূমিকা এবং বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতে পারে। অন্য নেতাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বয়ান নেওয়া হতে পারে।


পুলিশ যদি ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং নথিপত্র থেকে নতুন তথ্য পায়, তা হলে আরও নোটিস জারি হতে পারে। প্রয়োজন হলে মামলায় নতুন ধারা যোগ হওয়া বা কিছু ধারা বাদ দেওয়ার পথও খোলা থাকে। তবে তা নির্ভর করবে তদন্তে কী উঠে আসে তার ওপর।


ED অভিযানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নথিপত্র পরীক্ষা করার পর তদন্তকারীরা সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। কোনও আর্থিক অনিয়মের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তলব, জিজ্ঞাসাবাদ বা আরও তল্লাশির মতো পদক্ষেপ হতে পারে। প্রমাণ না মিললে তদন্ত অন্য পথে যেতে পারে।


গেরুয়া সম্মান যাত্রার ক্ষেত্রে নজর থাকবে প্রশাসনিক অনুমতি, পথনির্দেশ, পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর। মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলে তা আয়োজকদের জন্য বার্তা বহন করবে। কোনও সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিতে পারে।


রাজনীতির উত্তাপ এখন প্রতীক ও প্রক্রিয়ার লড়াই


পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তদন্ত এবং প্রতীক, দুইয়েরই আলাদা গুরুত্ব আছে। ক্যামাক স্ট্রিট কাণ্ড তদন্তের প্রক্রিয়া সামনে এনেছে। ED অভিযান আর্থিক নজরদারির প্রশ্ন তুলেছে। গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে মিছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।


এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিশে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা আগামী কয়েক দিনে আরও স্পষ্ট হবে। ৯ সেপ্টেম্বরের হাজিরা এবং মিছিল, সঙ্গে ED তদন্তের গতিপ্রকৃতি, সব মিলিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন পর্ব শুরু হতে পারে।


এখন নজর থাকবে তিন জায়গায়। পুলিশি তদন্ত কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে এগোয়, ED অভিযানে কী তথ্য উঠে আসে, এবং গেরুয়া রংকে কেন্দ্র করে ঘোষিত মিছিল কতটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এই উত্তরগুলিই ঠিক করবে, ক্যামাক স্ট্রিট থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক শুধু একটি ঘটনার তদন্তে থামবে, না কি তা রাজ্য রাজনীতির বড় সংঘাতের অংশ হয়ে উঠবে।


Comments

Rated 0 out of 5 stars.
No ratings yet

Add a rating
bottom of page